সিনেমা বানান, অনেক আইনজীবী অভিনয় ভালো করেন: রাজপালকে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট
দীর্ঘদিনের চেক বাউন্স-সংক্রান্ত এক মামলায় নির্দেশিত অর্থ জমা না দেওয়ায় বলিউড অভিনেতা রাজপাল যাদবকে তীব্র ভর্ৎসনা করেছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মুরলী প্রজেক্টস প্রাইভেট লিমিটেডের দায়ের করা সাতটি চেক বাউন্স মামলার বিচার চলাকালে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ অভিনেতার এই ভূমিকায় চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এর আগে, দিল্লি হাইকোর্ট এই সাতটি মামলার প্রতিটিতেই রাজপাল যাদবকে দোষী সাব্যস্ত করে তিন মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছিলেন।
সোমবারে মামলার শুনানি চলাকালীন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত রসিকতার ছলে রাজপালের কাছে জানতে চান, আজকাল তিনি কতগুলো সিনেমার কাজ করছেন। জবাবে রাজপাল যাদব আকুল কণ্ঠে বলেন, গত ১৬ বছরে আমি ২৫০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি। এই নির্দিষ্ট সিনেমাটিতে আমি ৫ কোটি রুপি বিনিয়োগ করে শেষ পর্যন্ত ২৫০ কোটি রুপির বিশাল ক্ষতির মুখে পড়েছি। তা ছাড়া ‘আতা পাতা লাপাতা’ সিনেমাটি বানাতে গিয়ে ইতিমধ্যেই আমার ১৭ কোটি রুপির লোকসান হয়েছে। মোট ২২ কোটি রুপি বিনিয়োগ করেও প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি মুক্তিই দেওয়া যায়নি, সেখান থেকে এক টাকাও আয় হয়নি। আপনারা আমাকে যখন যেখানে পাঠাতে চান পাঠান, আমি প্রস্তুত। অভিনেতার এ কথা শুনে প্রধান বিচারপতি বলেন, একটি ভালো ছবি তৈরি করুন, এখানে আদালতে আমাদের অনেক আইনজীবী আছেন যারা অভিনয়টাও বেশ ভালো করেন। পাশাপাশি একটি ভালো সিনেমা বানালে তার ক্ষতিগ্রস্ত ভাবমূর্তিও পুনরুদ্ধার হবে বলে অভিমত দেন প্রধান বিচারপতি। প্রত্যুত্তরে রাজপাল বলেন, এই লোকসানের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তিনি ইতিমধ্যেই ‘১৬ সাওয়ান ঝেল কে’ নামে একটি সিনেমার নামও ভেবে রেখেছেন।
আদালতে রাজপাল যাদবের আইনজীবী সিনিয়র অ্যাডভোকেট পি এস পাটোয়ালিয়া জানান, তার মক্কেলের জমিতে তৈরি করার মতো একজন ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কেই আদালতে উপস্থিত রাখা হয়েছে। তাদের কাছে ইতিমধ্যেই ১.১৫ কোটি রুপি প্রস্তুত আছে। এ ছাড়া রাজপালের পৈতৃক ভিটেমাটি কেনার মতোও লোক পাওয়া গেছে, তবে বর্তমানে ‘পিতৃপক্ষ’ চলায় এই মুহূর্তে জমি রেজিস্ট্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে ক্রেতা আদালতকে অবিলম্বে ৮৫ লাখ রুপি অগ্রিম দিতে রাজি আছেন, যাতে মোট পরিমাণ ২ কোটি রুপিতে পৌঁছায়। আগামী সোমবার থেকে ‘নবরাত্রি’ শুরু হলে তারা বিক্রয় দলিল রেজিস্ট্রি করতে চান।
উল্লেখ্য, বিগত শুনানিতে একাধিকবার নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও টাকা জমা না দেওয়ায় সুপ্রিম কোর্ট রাজপালের ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেছিলেন যে, কেবল অভিযোগকারী যাতে তাদের পাওনা অর্থ ফেরত পান, সেই স্বার্থেই আদালত এতদিন অভিনেতার আচরণ সহ্য করেছে; অন্যথায় তার আপিল সরাসরি খারিজ করে দেওয়া হতো। এর আগে আদালত রাজপালকে ২ কোটি রুপি জমা দেওয়ার জন্য এক দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন এবং জানিয়েছিলেন যে এটিই তার জন্য শেষ সুযোগ। অভিনেতার আইনজীবী জানান যে ইতিমধ্যেই ১.১৫ কোটি রুপি জমা দেওয়া হয়েছে, যা আজই আদালতে জমা করার নির্দেশ দেন সুপ্রিম কোর্ট এবং অবশিষ্ট ৮৫ লাখ রুপি আগামী সোমবারের মধ্যে আরটিজিএস-এর মাধ্যমে জমা দেওয়ার চূড়ান্ত নির্দেশ দেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপটে জানা যায়, ২০১০ সালে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য মেসার্স মুরলী প্রজেক্টস প্রাইভেট লিমিটেডের কাছ থেকে প্রায় ৫ কোটি রুপির আর্থিক সহায়তা নিয়েছিলেন রাজপাল যাদব। অভিযোগকারীর দাবি অনুযায়ী, পরবর্তীতে বকেয়া মিটিয়ে ফেলার জন্য রাজপাল ১.০৫ কোটি রুপি করে মোট সাতটি চেক প্রদান করলেও প্রতিটি চেকই ব্যাংকে প্রত্যাখ্যাত হয়। পরবর্তীতে ২০১২ সালে স্বাক্ষরিত এক সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী, রাজপাল যাদব, তার স্ত্রী রাধা এবং তাদের প্রতিষ্ঠান সুদে-আসলে প্রায় ১১ কোটি রুপি ফেরত দিতে সম্মত হয়েছিল।
দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে চলা এই বিবাদে গত ১৫ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট রাজপাল যাদবের আত্মসমর্পণের স্থগিতাদেশ ৫ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়িয়েছিলেন এবং অর্থ পরিশোধের একটি বাস্তবসম্মত প্রস্তাব নিয়ে আসার শেষ সুযোগ দিয়েছিলেন। সেই সময় বেঞ্চ মন্তব্য করেছিল, অভিনেতা আদালতে কেবল নাটক করছেন এবং তার অতীত আচরণ বিশ্বাসযোগ্য নয়। রাজপালের আইনজীবী সে সময় আদালতে জানিয়েছিলেন যে, তার মক্কেল ইতিমধ্যেই সাড়ে চার মাস কারাগারে কাটিয়েছেন এবং বিনোদনজগতের বন্ধুরা তাকে জামিনে মুক্ত করতে সাহায্য করেছিলেন। অপরদিকে, অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আইনজীবী সিনহা আদালতে জানান, তারা মূলত নিজেদের পাওনা টাকা দ্রুত ফেরত পেতে চান কারণ রাজপাল বারবার দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন।
এর আগে, গত ৮ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট রাজপালের আরজির ভিত্তিতে একটি নোটিশ জারি করেন এবং রেজিস্ট্রি শাখায় ৫ কোটি রুপি জমা দেওয়ার শর্তে তাকে আত্মসমর্পণের আদেশ থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেন। কিন্তু তারও আগে গত ১০ জুলাই দিল্লি হাইকোর্ট পাঁচ বছরেরও বেশি সময় (১,৮৯৪ দিন) দেরি করে আপিল করার আবেদন নাকচ করে দিয়ে রাজপাল যাদবের সাজা বহাল রেখেছিলেন। একই সঙ্গে সাতটি মামলার প্রতিটিতে অভিযোগকারীকে ১ কোটি রুপিরও বেশি অর্থ প্রদানের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। পূর্বে জমাকৃত প্রায় ২ কোটি রুপি এই বকেয়ার সঙ্গে সমন্বয় করা হবে বলে জানানো হয় এবং উচ্চতর আদালতে আপিল করার সুবিধার্থে তার সাজা দুই মাসের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছিল।
এ ছাড়া রাজপাল যাদবের স্ত্রী রাধাকান্তকে প্রতিটি মামলায় ৫.৫ লাখ রুপি করে জরিমানা করা হয়, যা অনাদায়ে তাকে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ২০১৮ সালের এপ্রিলে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের দেওয়া সাজা ২০১৯ সালের সেশন কোর্টে বহাল থাকলে, তার বিরুদ্ধেই হাইকোর্টে রিভিশন পিটিশন দায়ের করেছিলেন রাজপাল দম্পতি।
সূত্র: এনডিটিভি
বিডি প্রতিদিন/কেএইচটি